পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের আওতাধীন পল্লী দারিদ্র বিমোচন ফাউন্ডেশন (পিডিবিএফ) আবারও একটি সিন্ডিকেটের কবলে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিগত সরকারের সময়কার কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মচারী, সিবিএ নামধারী একটি গোষ্ঠীর আড়ালে নতুন মোড়কে নিজেদের পুনর্গঠিত করে সুপরিকল্পিতভাবে পুরনো প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে।
পল্লী দারিদ্র বিমোচন ফাউন্ডেশন আইন, ১৯৯৯-এর মাধ্যমে পল্লী বাংলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে পিডিবিএফ একটি অলাভজনক আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে। তবে শুরু থেকেই আইনের কিছু কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে, বিশেষ করে চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের সুযোগ থাকায়, অনেক ক্ষেত্রে নীতি ও আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানে সিবিএ কার্যক্রম চালুর সুযোগ থাকায়, কিছু অসাধু কর্মচারী নেতা ও চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের মধ্যে অশুভ আঁতাত গড়ে ওঠে। এই আঁতাতের মাধ্যমে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে পরিচালিত হয়েছে। বিশেষ করে বিগত প্রায় ২৫ বছর, এবং গত ১৬ বছরে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণআন্দোলনের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। তখন পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনা পরিচালকের চুক্তি বাতিল করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রেষণে একজন যুগ্মসচিবকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তাকে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিষ্ঠানটিতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন এবং একটি সুস্থ কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
তার নেতৃত্বে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়—প্রধান কার্যালয়ের ভবন ক্রয়, ১৬৬৫ জন জনবল নিয়োগ, ১০৫২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদোন্নতি, আয়কর সংক্রান্ত জটিলতার নিরসন এবং আগারগাঁও প্রশাসনিক এলাকায় প্রধান কার্যালয়ের জন্য সরকারি জমি বরাদ্দ লাভসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়।
কিন্তু এই কঠোর অবস্থানের ফলে দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের স্বার্থে আঘাত লাগে। ফলে তারা ওই কর্মকর্তাকে অপসারণের জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্র শুরু করে। তার বিরুদ্ধে বেনামি ও ভিত্তিহীন অভিযোগ দাখিল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার এবং কিছু অসাধু সাংবাদিকের মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচারের মতো কর্মকাণ্ড চালানো হয়।
অবশেষে ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তাকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে পিডিবিএফ-এর একটি ইতিবাচক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে এবং সিন্ডিকেট পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়। পরবর্তীতে একই কৌশলে আরেকজন প্রেষণপ্রাপ্ত পরিচালকের বদলিও নিশ্চিত করা হয়।
একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের আইন ও প্রবিধান লঙ্ঘন করে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা বিদ্যমান বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনুপস্থিতিতে প্রেষণ বা সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালকদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার বিধান রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পিডিবিএফ-এর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের স্বার্থে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রেষণে পরিচালকদের পদায়ন অব্যাহত রাখা জরুরি। পাশাপাশি, পল্লী দারিদ্র বিমোচন ফাউন্ডেশন আইন, ১৯৯৯ যুগোপযোগী করে সংশোধনের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা কাঠামোয় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা অত্যন্ত প্রয়োজন।
পল্লী বাংলার দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই প্রতিষ্ঠানটিতে সুশাসন, জবাবদিহিতা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।