সংগঠন ও সংগঠক নিস্ক্রিয় হওয়ার কয়েকটি কারণ:
১. কর্মসূচি (Programme/ Project) :
আমরা উৎসব-পূজারী ও উৎসবপ্রিয়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, ২১ শে ফেব্রুয়ারি প্রভৃতি দিবস পেলে জীবন বাজি রেখে উদযাপন করি। কোনও কিছুতে লেগে থাকতে পারি না। সত্যিকার সমৃদ্ধি তো উৎসব নয়; কর্মসূচি। কর্মসূচি আমাদের পাওয়া যায় না। কর্মসূচি চলে নিয়মিতভাবে। মানবজীবনের সমৃদ্ধি ও সাফল্য গড়ে ওঠে কর্মসূচির ভেতর দিয়ে।
২. কর্মোদ্দীপনা (Motivation):
অনিচ্ছা বা অনাগ্রহের কারণে আমরা উদ্যমহীন, কর্মবিমুখ, নেতিবাচক, অসহায়, পলায়নপর ও দুর্বল। সর্বপরি আমাদের কর্মোদ্দীপনা না থাকায় সংগঠন নিস্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছে।
৩. বিরোধিতা (Opposition):
দক্ষ ও সক্রিয় সংগঠকদের বিরুদ্ধে আমাদের ক্ষুদ্রতা, হীনতা, বিরোধিতা ও সহিংসতা দিয়ে তাদের শেষ করে ফেলি।
৪. স্বজনপ্রীতি (Nepotism):
স্বজনপ্রীতি আমাদের সমাজে একটি মরণব্যাধির রূপ ধারণ করেছে। চাকরি, ব্যবসা, রাজনীতি, প্রশাসন, সংগঠন সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে এ স্বজনপ্রীতি। এটি ধ্বংস করে দিয়েছে ন্যায়বিচার, ন্যায়নীতি ও নিরপেক্ষতার আদর্শকে।
আমরা যে যেই দায়িত্বে থাকি চেষ্টা করি, নিজেদের আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিতদের একটু প্রাধান্য দিতে, একটু সুযোগ-সুবিধা দিতে। যা মোটেও কাম্য নয়। দুর্নীতির অন্যতম কারণও এই স্বজনপ্রীতি।
মানুষের অভ্যাস হলো, নিজের লোকজন কোনো বড় অন্যায় করলেও তা চোখে পড়ে না। ধরা পড়লেও তেমন অপরাধ মনে হয় না। তাই এর বিচারও হয় না।
কিন্তু অন্য কেউ ছোটখাটো অন্যায় করলেও তা অনেক বড় মনে হয়। তার বিচার করার জন্য উঠে পড়ে লেগে যায়। করতে চায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা।
আর এই স্বজনপ্রীতির জন্য শত মেধার মৃত্যু হয়ে যায় প্রকাশ্যে, নির্বাক, অগোচরে।
৫. সুবিধাবাদী চরিত্র (Opportunist character) :
যখন মানুষ বিপদে পড়ে, তখন এক রকম কথা বলে আবার বিপদমুক্ত হলে তার আসল চরিত্র প্রকাশ পায়।
হুমায়ূন আহমেদ তাঁর আত্মজীবনীতে এক লোকের ইউটার্নের একটি ঘটনা উল্লেখ করেন।
“আমি একজন ঘোরতর নাস্তিককে চিনতাম, তার ঠোঁটে একবার একটা গ্রোথের মতো হলো। ডাক্তাররা সন্দেহ করলেন ক্যানসার। সঙ্গে সঙ্গে সেই নাস্তিক পুরোপুরি আস্তিক হয়ে গেলেন। তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে যান। বায়োপসির পর ধরা পড়ল গ্রোথের ধরন খারাপ নয়। লোকালাইজড গ্রোথ। ভয়ের কিছু নেই। অপারেশন করে ফেলে দিলেই হবে। সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রলোক আবার নাস্তিক হয়ে পড়লেন। ভয়াবহ ধরনের নাস্তিক।” (হুমায়ূন আহমেদ, ছায়াসঙ্গী; পৃষ্ঠা ২১)
“এমন কিছু মানুষ আছে যারা শুধু/ হাত মেলায়/ সুসময়ে কাঁধে কাঁধে কাঁধ মেলায়/ তারা শুধু বন্ধু সেজে আসে যায়/ দুঃসময়ে পালিয়ে বেড়ায়।”
সুবিধাবাদীতা আত্মাকে কুৎসিত করে দেয় ।- ডেভিড মিচেল
সুবিধাবাদীতা হলো ঘৃণ্য দুষ্টতা, যা কেউ অন্যকে ক্ষমা করে না এবং নিজের মধ্যে নিজে ছাড়া অন্য কেউ থাকে না।-হেনরি ওয়ার্ড বিচার
৬. ২০ জনে ১ জন ( 20:1):
সমষ্টি তখনই চলতে শুরু করে যখন কোন অদমিত ও অনুপ্রাণিত ব্যক্তির চলা শুরু হয়। তাই ব্যক্তিই সংগঠনের আসল জন্মদাতা।
একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হবে কি হবে না তা মূলত নির্ভর করে একটি মানুষের ওপর; সে-গন্তব্যের জন্য জন্মান্ধের মতো, আত্মবিধ্বংসীর মতো ক্ষিপ্র হয়ে ঝাপিয়ে পড়ার ওপর।
প্রত্যেকটি সংগঠনের মধ্যেই বেশ কিছু সংসপ্তক মানুষ আছে। তারা প্রায় আত্মঘাতী পর্যায়েই কাজ করে। না হলে সংগঠন জন্ম নিতে বা চলতে পারতো না।কিন্তু এদের সংখ্যা খুবই কম। ২০ জনে ১ জন বা ২ জন। এরা জীবন বাজি রেখে সংগঠনের জন্যে আত্মাহুতি দেয়; কিন্তু বাকি অপদার্থের নিষ্ঠুর বৈরিতার কারণে তারা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে যায়। ফলে অক্ষমের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সক্ষমের কার্যকারিতাকে ব্যর্থ করে দেয়।
৭. হীনতা ও হীনমন্যতা (Inferiority & Inferiority complex):
হীনমন্যতা হলো এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি নিজেকে অপর্যাপ্ত বা অযোগ্য মনে করেন—যুক্তিসংগত বিচারের ভিত্তিতে নয়, বরং আবেগের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কারণে। শক্তি, সাহস, উদ্যম, কাজ ও স্বাস্থ্যে অনেক জাতির চেয়ে আমরা নিচে। তাই আমাদের আত্ম-সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, অন্যের সাথে তুলনা বন্ধ করতে হবে, ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
৮. শঠতা (Craftiness):
ছলে বলে কলে কৌশলে সংগঠনের পদ-পদবী কামনাটাই প্রধান উদ্দেশ্য।

লেখক: আশরাফ ইকবাল
শিক্ষক, সাংবাদিক ও সংগঠক।
আরও পড়ুন : শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে সামাজিক সংগঠনের করনীয়