মুন্সীগঞ্জে সাবেক কাউন্সিলরসহ দুজনের বিরুদ্ধে ফ্যামিলি কার্ড-ভাতার নামে লাখ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ
‘ফ্যামিলি কার্ড করে দেব’, ‘বয়স্ক ভাতার তালিকায় নাম উঠিয়ে দেব’, ‘প্রতিবন্ধী ভাতা পাইয়ে দেব’—এমন নানা আশ্বাস দিয়ে মুন্সীগঞ্জের মিরকাদীম পৌরসভার দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাবেক সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর শিউলি বেগম এবং তিলার্দি চর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা বেদে সর্দারনী রুনা বেগমের দিকে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারি বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ৩২০ টাকা থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। একই পরিবারের একাধিক সদস্যের কাছ থেকেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শুধু ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড এবং তিলার্দি চর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের কাছ থেকেই কয়েক লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, টাকা নেওয়ার সময় দ্রুত ফ্যামিলি কার্ড বা ভাতার ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও মাসের পর মাস পার হয়ে যাচ্ছে, মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সুবিধা। টাকা ফেরত চাইতে গেলে দেওয়া হচ্ছে নানা অজুহাত। কেউ কেউ অভিযুক্তদের বাড়িতে গিয়ে তাদেরও পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।
মিরকাদীম পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর শিউলি বেগমের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নিজেকে মিরকাদীম পৌর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শিপন জমিদারের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। যদিও শিপন জমিদার জানিয়েছেন, শিউলি বেগম তার কোনো আত্মীয় নন।
অন্যদিকে তিলার্দি চর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা বেদে সর্দারনী রুনা বেগমের বিরুদ্ধে আশ্রয়ণ প্রকল্প ও আশপাশের বাসিন্দাদের কাছ থেকে ফ্যামিলি কার্ড, বয়স্ক ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতার কথা বলে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
মিরকাদীম পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের নগর কসবার কুড়ি বাড়ি (ধোপা বাড়ি) এলাকার বৃষ্টি বেগম অভিযোগ করে বলেন, সাবেক কাউন্সিলর শিউলি বেগম ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে ৮ হাজার টাকা নিয়েছেন। তার মা ও বোনের কাছ থেকেও টাকা নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে একই পরিবারের কাছ থেকে ১৮ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বৃষ্টি বেগম বলেন, “এই এলাকার আরও অনেকের কাছ থেকেই টাকা নেওয়া হয়েছে। আমরা আমাদের টাকা ফেরত চাই।”
একই এলাকার মমতাজ বেগম বলেন, “কমিশনার শিউলি বেগম আমার কাছ থেকে ৪ হাজার টাকা নিয়েছেন। তিন-চার মাস ধরে ঘুরাচ্ছেন। আমার কেউ নেই, অনেক বিপদে আছি। আমার টাকাটা ফেরত এনে দেন।”
তিলার্দি চর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা কোহিনূর বেগম বলেন, বেদে সর্দারনী রুনা বেগম ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা করে দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা নিয়েছেন। এখন আর কার্ড করে দিচ্ছেন না। আশ্রয়ণ প্রকল্পের আরও অনেক বাসিন্দার কাছ থেকেও টাকা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
একই এলাকার ইয়াসমিন বেগম বলেন, “রুনা আপা কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকে ৩২০ টাকা নিয়েছেন।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ার আশায় দরিদ্র মানুষ অনেক সময় যাচাই-বাছাই না করেই বিভিন্ন ব্যক্তির কথায় বিশ্বাস করেন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ সরকারি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে টাকা আদায় করছেন। পরে কার্ড বা ভাতা করে দেওয়ার কথা বলে ভুক্তভোগীদের দিনের পর দিন ঘোরানো হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাবেক সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর শিউলি বেগম। তিনি বলেন, “সব মিথ্যা কথা। আমি কারও কাছ থেকে টাকা নেইনি। আমি আওয়ামী লীগ করতাম বলে আমার নামে মিথ্যা প্রচার করছে।”
মিরকাদীম পৌর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শিপন জমিদারের আত্মীয় পরিচয় দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে শিপন জমিদার বলেন, “আমার কোনো আত্মীয় নেই। অপরাধ করলে পুলিশে ধরায় দেন।”
এ বিষয়ে বেদে সর্দারনী রুনা বেগমের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তার বাড়িতে গিয়ে তার ঘরটি তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা বলেন, “আপনি আমাকে নাম-ঠিকানাসহ তথ্য দেন। আমি তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব।”
সচেতন মহল বলছে, সরকারি ফ্যামিলি কার্ড, বয়স্ক ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীর কোনো সুযোগ নেই। তাই এসব সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্বাচনের নিয়ম ও আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রচার চালানো দরকার।
সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ, সরকারি কোনো ভাতা বা ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার নামে কেউ টাকা চাইলে তার পরিচয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদন যাচাই করতে হবে। এ ধরনের অভিযোগ থাকলে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়, উপজেলা প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হবে।





আপনার মতামত লিখুন