ডিসেম্বর ১১, ২০১৯ ৬:২৪ অপরাহ্ণ
সর্বশেষ
ঝুঁকিতে পড়তে পারে বাংলাদেশের রপ্তানি

ঝুঁকিতে পড়তে পারে বাংলাদেশের রপ্তানি

যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ বাণিজ্যের দিক থেকে ক্ষতির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে পোশাক খাতে কোটামুক্ত বাণিজ্যসুবিধা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্রেক্সিটের পরোক্ষ প্রভাবে কোন্ও একটি বিশেষ দেশের পাশাপাশি গোটা বৈদেশিক বাণিজ্যেই ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, আশঙ্কা অনুযায়ী অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে ক্রেতাদের আর্থিক ক্ষমতা কমবে, ফলে তারা আগের চেয়ে কম পণ্য কিনবেন। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশ যেসব সমঝোতা আছে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সেগুলো নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। নতুন পরিস্থিতিতে নতুন করে চুক্তি করতে হতে পারে। সেগুলো সময়সাপেক্ষ হতে পারে এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে জটিলও। তবে হঠাৎ করেই সেসব সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে তাও নয়। কিন্তু এসব নিয়ে ভাবতে হবে এখনই, মত তাদের।

উদ্বেগ আছে খোদ সরকারেও। জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এরই মধ্যে তার দুশ্চিন্তার কারণ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যিক সম্পর্ক হয়েছে ইইউর মাধ্যমে। এই সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে প্রায় ১০ বছর লেগেছিল। যুক্তরাজ্য এই জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ার কারণে এখন বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সবকিছু নতুন করে করতে হবে। যা সময়সাপেক্ষ হবে’।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমরা পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আমাদের চুক্তি ছিল। এখন ব্রিটেনের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে কী হবে সেটি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। দ্রুতই এসব বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হবে’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক রাশেদুজ্জামান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমরা যুক্তরাজ্য ও ইইউ রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে যেভাবে কোটামুক্ত বাজার সুবিধা পেতাম সেটা হারাতে হতে পারে। যুক্তরাজ্যে আমাদের বড় শ্রম বাজার আছে। আমাদের অনেক মানুষ কাজ করে সেখানে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকায় ব্রিটেন থেকে কাজ করতে সহজে তারা ইউরোপের অন্যান্য দেশে যেতে পারতো। কিন্তু এখন থেকে সেটি পারবেন না তারা’। তবে সরকার উদ্যোগী হয়ে ব্রিটেনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে চুক্তিগুলো পুনর্মুল্যায়ন করলে ক্ষতিকর প্রভাব এড়ানো সহজ হবে বলে মনে করেন রাশেদুজ্জামান।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের বাণিজ্যের অন্যতম খাত হচ্ছে যুক্তরাজ্য ও ইইউ। যুক্তরাজ্যের নতুন সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ বিদ্যমান সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। বাংলাদেশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রাপ্ত সুবিধাগুলো ধরে রাখা।

বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুারোর হিসেবে দেখা গেছে, বাংলাদেশ ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩.২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পণ্য রপ্তানি হয়েছে যুক্তরাজ্যে। যা গত বছরের মোট রপ্তানি আয়ে ২১ দশমিক দুই আট শতাংশ।

যুক্তরাজ্য ইইউ ত্যাগ করায় বাংলাদেশ এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জাহিদ হোসেন। তার বিবেচনায় নতুন পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো ছাড়াও বিশ্বের অনেক উন্নত দেশই অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে। এর পরোক্ষ প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের ওপরও।

এরই মধ্যে ব্রিটেনে গণভোটের প্রভাব পড়েছে ইউরোপের পুঁজি ও মুদ্রাবাজারে। এক দিনেই ডলারের বিপরীতে পাউন্ডের দাম কমেছে ১০ শতাংশ। ৩১ বছরের মধ্যে ব্রিটিশ মুদ্রার মান এত নিচে নামেনি কখনও। কমেছে ইউরোর মানও। ধস নেমেছে পুঁজিবাজারেও। কেবল লন্ডনের স্টক এক্সচেঞ্জ নয়, সুদূর জাপানেও কমেছে সূচক। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ তো বটেই সূচক পড়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান পুঁজিবাজারেও।

যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে গেলে গোটা বিশ্বই আবার অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে পড়তে পারে-আগেই সতর্ক করে দিয়েছিল ইংল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর বিশ্বমন্দার সময় বাংলাদেশের রপ্তানি আয় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা নিয়ে দুশ্চিন্তা   

স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে ১৯৭১ সালের পর থেকে বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে আসছে ব্রিটেন। ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ায় ইইউ ব্লকেও সেই সুবিধা পেয়ে আসছে বাংলাদেশ। এই সুবিধার কারণেই বাংলাদেশ বর্তমানে সারা বিশ্বে তৈরি পোশাক শিল্পের বাজারে দ্বিতীয় রপ্তানিকারকের অবস্থানে উঠে এসেছে।

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকাকালে ব্রিটেন আমাদের যে জিএসপি সুবিধা দিত তা এখনও বলবৎ রাখবে কি না সে বিষয়টিই আমাদের সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে’।

আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেন বের হওয়ার পর আমাদের বাণিজ্যর উপর কি প্রভাব পড়বে তা নির্ভর করবে আমাদের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের উপর। কারণ, আমাদের তৃতীয় সর্বোচ্চ বাণিজ্য হয় যুক্তরাজ্যের সাথে। আর ইউরোপের মধ্যে দ্বিতীয়। তাই যুক্তরাজ্য আমাদেরকে কীভাবে জিএসপি সুবিধা দিবে তা ভাবার বিষয়। সরকারকে এখনই বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। তারা যদি যুক্তরাষ্ট্রের মত জিএসপি সুবিধা বন্ধ করে দেয় তাহলে আমাদের বাণিজ্যে বিশাল প্রভাব পড়বে’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক রুহুল আমিন বলেন, যুক্তরাজ্যের ইইউ ত্যাগে রেমিটেন্সেও প্রভাব পড়তে পারে। নতুন চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত রেমিটেন্স পাঠানো কঠিন হতে পারে। তাছাড়া ইউরোপে বাংলাদেশিদের সহজে যাওয়ার সুযোগ কমে যাবে। এখন লন্ডনের ভিসা পেলে অন্য আরও ২৮টি দেশ ঘুরে আসা যায়। একইভাবে একটি দেশে ওয়ার্ক অর্ডার পাওয়া গেলে সেখানে কাজ না পেলে অন্য দেশে যেতে পারতো মানুষ। সেই সুযোগও সীমিত হয়ে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top